ঢাকা , বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ , ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক সাহসী কিশোরীর লড়াইয়ে বদলে গেছে পুরো গ্রামের ভবিষ্যত

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৭-২২ ০১:১৯:৪৮
এক সাহসী কিশোরীর লড়াইয়ে বদলে গেছে পুরো গ্রামের ভবিষ্যত এক সাহসী কিশোরীর লড়াইয়ে বদলে গেছে পুরো গ্রামের ভবিষ্যত
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-


কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের ধরলা নদীতীরের প্রত্যন্ত গ্রাম দোলন। নদীর তীর রক্ষা বাঁধের পাশে, একটি খালের কিনারে কৃষক পরিবারের ছোট্ট একটি বাড়ি। সেই বাড়ি থেকেই ছড়িয়ে পড়ছে বদলে যাওয়ার গল্প। একসময় যে কিশোরী নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকাতে লড়েছিলেন, আজ তিনিই গ্রামের শত শত কিশোরীর কাছে আশার নাম। তরুণীর নাম মোছাঃ সুইটি আক্তার। কৃষক দম্পতি মোঃ তোফাজ্জল হোসেন ও মোছাঃ হাসেনা বেগমের মেয়ে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকিয়েছিলেন তিনি। সেই ঘটনার এক দশক পর চলতি বছর কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করেছেন। এখন তার সময় কাটে গ্রামের কিশোরীদের নিয়ে। বাল্যবিয়ের ক্ষতি, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলছেন তাদের।


ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে গ্রামের চেনা বাস্তবতা। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই শুরু:- মোছাঃ সুইটি আক্তারের কাছে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারও ফল। তিনি বলেন, বড় বোনের বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১০ বছর বয়সে। পরের বছরই তিনি সন্তানের মা হন। এরপর থেকেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। সেই অভিজ্ঞতা কাছ থেকে দেখেই নিজের বিয়ের প্রস্তাবে ‘না’ বলেছিলেন মোছাঃ সুইটি আক্তার। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বিয়ের কথাবার্তা এগিয়েছিল। কিন্তু তিনি রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত বিয়েটি ভেঙে যায়। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, উপযুক্ত বয়সের আগে এবং স্বাবলম্বী না হয়ে বিয়ে করবেন না। উঠান বৈঠক থেকে স্কুলের শ্রেণিকক্ষ:- এসএসসি পাস করার পর টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন মোছাঃ সুইটি আক্তার। পাশাপাশি শুরু করেন কিশোরীদের নিয়ে উঠান বৈঠক। পরে একে একে বিভিন্ন স্কুলেও সচেতনতামূলক সেশন পরিচালনা শুরু করেন। মোছাঃ সুইটি আক্তার বলেন, শুরুটা সহজ ছিল না। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষকে বোঝাতে গিয়ে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। অনেক অভিভাবক মেয়েদের বাল্যবিয়ে না দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কিশোরীদের নেতৃত্ব তৈরিরও চেষ্টা করছেন তিনি, যাতে ভবিষ্যতেও এই কাজ চলতে পারে। বদলে গেছে গ্রামের চিত্র:- মোছাঃ সুইটি আক্তারের উদ্যোগে গ্রামের অনেক অভিভাবকের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে।


স্থানীয় বাসিন্দা মোছাঃ শাবানা বেগম বলেন, তার নিজের বিয়ে হয়েছিল ১৪ বছর বয়সে। সেই বয়সে বিয়ের শারীরিক ও মানসিক প্রভাব তিনি নিজেই অনুভব করেছেন। তাই একমাত্র মেয়ের বাল্যবিয়ে দেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, মোছাঃ সুইটি আক্তার বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক নিয়ে নিয়মিত কথা বলেন, যা অভিভাবকদের ভাবতে শিখিয়েছে। বকসীগঞ্জ রাজিবিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছাঃ হুমাইয়া আক্তার, মোছাঃ জুঁই মনি ও তাদের সহপাঠীরা জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে ওঠার মধ্যে তাদের শ্রেণির অন্তত ১০ থেকে ১২ জন ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। অনেকেই মা হয়েছেন, কেউ সন্তান হারিয়েছেন। এমনকি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক সহপাঠী ছেলেরও বিয়ে হয়েছিল। সুইটির কাছ থেকে বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক জানার পর তারা নিজেরাও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পরিবারের মধ্যেও এসেছে পরিবর্তন। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছাঃ আর্জিনা বেগম বলেন, এই এলাকায় বাল্যবিয়ের প্রবণতা এখনও বেশি। সুইটির কাজের ফলে অনেক পরিবার সচেতন হচ্ছে, কিশোরীরাও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাচ্ছে। তবে অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বাল্যবিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। শুধু বাল্যবিয়ে নয়, স্বাস্থ্য সচেতনতাও জরুরি:- বাল্যবিয়ের ক্ষতির পাশাপাশি কিশোরীদের মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করছেন সুইটি। তিনি বলেন, বাল্যবিয়ে হলে প্রথমেই মেয়েদের স্বপ্ন থেমে যায়। পড়াশোনা বন্ধ হয়, সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে কাঁধে। অল্প বয়সে গর্ভধারণে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। অনেক সময় প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম নিতে পারে, জরায়ুসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যজটিলতাও দেখা দেয়। মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে তিনি কিশোরীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের পরামর্শ দেন। প্রতি তিন থেকে চার ঘণ্টা পর ন্যাপকিন পরিবর্তন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ব্যথা হলে বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথাও বলেন। মোঃ হুমাইয়া আক্তার ও মোছাঃ মোনালিসা জাহান জানায়, মোছাঃ সুইটি আক্তারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তারা নিজেরা মেনে চলার পাশাপাশি অন্য কিশোরীদেরও জানায়। তারা আরও বলে, আগে স্কুলে মাসিক শুরু হলে অস্বস্তিতে বাড়ি ফিরে যেতে হতো। এখন সুইটির উদ্যোগে বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষকের কাছে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখা হয়। প্রয়োজন হলে স্বল্প মূল্যে তা সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে পারে শিক্ষার্থীরা। এতে তাদের ভোগান্তি অনেক কমেছে। সুইটির মায়ের উপলব্ধি:- মোছাঃ সুইটি আক্তারের মা মোছাঃ হাসেনা বেগম নিজের জীবনের ভুলের কথাও অকপটে স্বীকার করেন।

তিনি বলেন, এক মেয়েকে বাল্যবিয়ে দিয়ে ভুল করেছিলেন। পরে সুইটির ক্ষেত্রেও একই সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলেন। এখন মনে হয়, সেই ভুল থেকে বেঁচে গেছেন। তিনি আরও বলেন, এখন আমার মেয়ে অন্য মেয়েদের জীবন বাঁচানোর জন্য কাজ করছে। ওর কাজে আমাদের কোনও আপত্তি নেই।’

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ